মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি ঘোষণার শুরু থেকে আলোচনায় রয়েছে গাড়ি শিল্প। বিষয়টি নিয়ে চলছিল তর্কবিতর্ক। এর মাঝে গত বুধবার হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানীকৃত গাড়ি ও যন্ত্রণাংশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে, যা স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনকে উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে পূর্বাভাস দিয়েছে, গাড়ির ওপর শুল্ক বাবদ যুক্তরাষ্ট্র বছরে রাজস্ব আহরণ করবে ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলার। খবর এপি।
‘এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরো ত্বরান্বিত করবে’ উল্লেখ করে এদিন সাংবাদিকদের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা কার্যকরভাবে ২৫ শতাংশ শুল্ক আদায় করব।’
হোয়াইট হাউজ বলছে, ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে গাড়ি আমদানি থেকে বার্ষিক রাজস্ব হবে ১০ হাজার কোটি ডলার। তবে এতে কিছু জটিলতা রয়েছে। কারণ মার্কিন নির্মাতারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে। তাই এপ্রিলে এ শুল্ক কার্যকর হলে গাড়ি নির্মাতারা বাড়তি খরচের মুখে পড়বেন এবং কমতে পারে বিক্রি।
ট্রাম্পের যুক্তি হলো অতিরিক্ত শুল্ক এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রে আরো বেশি কারখানা চালু হবে এবং গাড়ি উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে ছড়িয়ে থাকা ‘অযৌক্তিক’ সরবরাহ চেইনের অবসান ঘটবে।
এ ঘোষণার পর বুধবার জেনারেল মোটরসের শেয়ারদরে প্রায় ৩ শতাংশ পতন ঘটে। ফোর্ডের সূচক সামান্য বাড়লেও জিপ ও ক্রাইসলারের প্যারেন্ট প্রতিষ্ঠান স্টেলান্টিসের শেয়ারদর প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ কমে যায়।
দীর্ঘদিন ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে আসছেন, তার প্রধান নীতিগুলোর একটি হবে আমদানীকৃত গাড়ির ওপর শুল্ক আরোপ। এতে গাড়ি উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর হবে এবং বাজেট ঘাটতি কমবে। তবে উৎপাদন কেন্দ্র বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকায় প্রতিযোগিতামূলক দামে গাড়ি বিক্রি করতে পারেন বলে দাবি মার্কিন ও বিদেশী গাড়ি নির্মাতাদের। এখন নতুন কারখানা তৈরি করতে সময় লাগবে। ফলে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হতে অনেক বছর লেগে যেতে পারে।
পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের সিনিয়র ফেলো ও অর্থনীতিবিদ মেরি লাভলির ভাষ্যে, শুল্ক আরোপের কারণে গাড়ির দামে ব্যাপক বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। এতে ক্রেতাদের পছন্দের পরিধি সংকুচিত হতে পারে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর ওপর শুল্ক বেশি প্রভাব ফেলে।
তিনি আরো জানান, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে গাড়ির গড় মূল্য প্রায় ৪৯ হাজার ডলার। শুল্ক বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার নতুন গাড়ি কেনার সামর্থ্য হারাবে। ফলে তারা পুরনো গাড়ি ব্যবহারে বাধ্য হবে।
এদিকে শুল্ক ঘোষণার পর পরই বৈশ্বিক নেতারা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এর অর্থ হলো ডোনাল্ড ট্রাম্প চলমান বাণিজ্যযুদ্ধকে আরো তীব্র করে তুলছেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, ‘এটি সরাসরি আক্রমণ। আমরা আমাদের শ্রমিকদের, কোম্পানিগুলোকে রক্ষা করব। আমাদের দেশকে রক্ষা করব।’
ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন মার্কিন সিদ্ধান্তের হতাশা প্রকাশ করেন। সঙ্গে এও জানান, নিজস্ব ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের রক্ষা করবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তিনি বলেন, ‘শুল্ক হলো কর—যুক্তরাষ্ট্র বা ইইউ হোক এটি ব্যবসার জন্য খারাপ এবং ভোক্তাদের জন্য আরো খারাপ।’
অবশ্য নতুন গাড়ির ক্রেতাদের জন্য করছাড়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। পরিকল্পনা অনুযায়ী, যদি কেউ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি গাড়ির জন্য ঋণ নেন, তাহলে ওই ঋণের ওপর প্রদত্ত সুদ ফেডারেল আয়কর থেকে বাদ দেয়া যাবে। তবে এ ছাড় কিছুটা হলেও রাজস্ব কমিয়ে দেবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন শুল্ক সম্পূর্ণ গাড়ির পাশাপাশি যন্ত্রাংশের ওপরও প্রযোজ্য হবে। বিদ্যমান যেকোনো করের ওপরে এটি আরোপ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মধ্যে স্বাক্ষরিত ইউএসএমসিএ বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যেসব গাড়ি ও যন্ত্রাংশ আমদানি করা হবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের উপাদানের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বসবে।
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, শুল্ক আরোপের ফলে মার্কিন নির্মাতারা উৎপাদন বাড়াতে পদক্ষেপ নেবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১০ লাখ কর্মী গাড়ি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন শিল্পে কর্মরত, যা ২০০০ সালের তুলনায় ৩ লাখ ২০ হাজার কম। এছাড়া গাড়ি ও যন্ত্রাংশ ডিলারশিপে যুক্ত রয়েছে ২১ লাখ মার্কিন।
২০২৪ সালে প্রায় ৮০ লাখ গাড়ি ও হালকা ট্রাক আমদানি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, যার মূল্য ছিল ২৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এ সময় প্রধান সরবরাহকারীর তালিকায় ছিল মেক্সিকো, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। এ সময় যন্ত্রাংশের আমদানি ১৯ হাজার ৭০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়, যার প্রধান উৎস ছিল মেক্সিকো, কানাডা ও চীন।
২ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া চীন, কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর এরই মধ্যে কিছু শুল্ক বাস্তবায়ন হয়েছে। ভেনিজুয়েলা থেকে যেকোনো দেশের জ্বালানি আমদানিও এসেছে শুল্কের আওতায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী পারস্পরিক শুল্ক আরোপের ফলে বড় আকারের বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হতে পারে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকিস্বরূপ এবং ভোক্তা ও ব্যবসায়িক পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।